জীবন ও সংগ্রাম
অধ্যাপক গোলাম আযম একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি বিশ্বনন্দিত ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক জিএস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্থান-পতনের প্রতিটি ঘটনায় তার ভূমিকা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের মাটি, আলো-বাতাস এবং মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে আছে তার জীবন।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯২২ সালের ৭ই নভেম্বর মঙ্গলবার ঢাকা শহরের লক্ষ্মীবাজারস্থ বিখ্যাত শাহ সাহেব বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ মাওলানা আব্দুস সোবহান এবং পিতা মাওলানা গোলাম কবির ছিলেন প্রখ্যাত আলেম।
তাদের আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে। বংশপরম্পরায় তারা অন্তত ৭ পুরুষ যাবত ওই অঞ্চলের বাসিন্দা এবং একটি ঐতিহ্যবাহী ধার্মিক পরিবারের উত্তরসূরী।
শিক্ষা জীবন
তিনি ১৯৩৭ সালে জুনিয়ার মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৪ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেন। ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৪৮ সালে পরীক্ষা দিতে না পারলেও ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষকতা ও তাবলীগ
১৯৫০ সালে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তাবলীগ জামায়াতের সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত রংপুরের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
জামায়াতে ইসলামীতে দায়িত্ব পালন
১৯৫৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের পর ১৯৫৫ সালে কারাগারে থাকাকালীন রুকন হন। ১৯৬৯-১৯৭১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের শীর্ষ পদে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় আমীরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ড্যাক
আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালে গঠিত 'পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট' (PDM) এর পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে তিনি কাজ করেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে 'ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি' (DAC) গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি আইয়ুব খানের গোল টেবিল বৈঠকেও জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
লেখক ও চিন্তাবিদ
তিনি তাফসীর, সীরাত, সংগঠন ও রাজনীতি বিষয়ে মোট ১০৭টি বই লিখেছেন। তার লেখা বইসমূহ ইংরেজি, উর্দু, তামিল ও অসমীয়া ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৫৮ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদনা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর লেখনী ও চিন্তা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং সমাজ সংস্কার ও ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
ভিডিও: অধ্যাপক গোলাম আযমের বক্তব্য - তাফসীর মাহফিল চট্টগ্রাম
বিদেশে আমন্ত্রিত বক্তা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে ওয়ামী (WAMY) এর উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। তুরস্কের রিফা পার্টি থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকার ইসনা (ISNA) এবং ইতনা (ICNA) কনভেনশনে তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
কারাবরণ ও শেষ কথা
তিনি তার জীবনে মোট ৫ বার কারাবরণ করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশে কারাবরণ করেন এবং প্রিজন সেলে থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "মু'মিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতে পারে না। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না, কারণ মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।"
ভাষা আন্দোলনের নেতা
১৯৪৭-৪৮ সেশনে ডাকসুর জিএস হিসেবে তিনি লিয়াকত আলী খানের কাছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্মারকলিপি পাঠ করেন। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশিষ্ট নেতারাও তার সাহস ও অমায়িক ব্যবহারের প্রশংসা করেছেন।